সুবর্ণ এক্সপ্রেস থেকে: বাংলাদেশের ট্রেন নিয়ে একটি কৌতুক বেশ জনপ্রিয়, চোখে-মুখে বিস্ময় নিয়ে এক ভদ্রলোক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো। একবার ঘড়ির দিকে তাকান, একবার ট্রেনের দিকে।
এদিনও ঘটনা তাই। টিকিটে যাত্রার তারিখ- ০১/০৩/১৬, সময়- ০৭:০০। ক্যালেন্ডার বলছে, চলতি বছর মঙ্গলবারই ১ মার্চ, ছেড়েছেও কাঁটায় কাঁটায় ৭টায়। তাহলে?
অব্যয়বাচক শব্দটির উত্তর আমাদের নিয়ে যায় ২৭ ফেব্রুয়ারির বিকেলে। হঠাৎ শ্রদ্ধেয় এডিটর ইন চিফের তলব। যেতেই- শোনো, তোমরা নয়জন চট্টগ্রাম যাচ্ছো। ২৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর ৩টায় সুবর্ণ এক্সপ্রেস, একদম ঠিক সময়ে ছাড়ে।

পরদিন কমলাপুর রেলস্টেশনে ঘটনা তাই- একদম কাঁটায় কাঁটায়! বিপুল বিস্ময়ে স্যারকে জানাতেই জবাব এলো, ইটস ভেরি মাচ অন টাইম! সেফ জার্নি, এনজয়।
তাত্ত্বিকদের ভাষায় যাকে বলে, ন্যাচারাল ক্যাটাগরাইজেশন। সময়ানুবর্তি মানুষের কাছে সময়ানুবর্তি বিষয় ও বস্তুর খোঁজ।
বাংলানিউজ চট্টগ্রাম ব্যুরোর সহকর্মীর ভাইয়ের বিয়ে, তাও আবার ঐতিহাসিক চট্টলায়- ২৯ ফেব্রুয়ারি তথা লিপইয়ারে এর চেয়ে স্মরণীয় আর উপভোগ্য উপহার আর হতেই পারে না!

হুল্লোড় করে দলবেঁধে ঘোরা, খাওয়া, অফুরান আনন্দ- সবই হলো। মঙ্গলবার সক্কাল করে ফেরার দিনও সুবর্ণর একই আচরণ। কাঁটায় কাঁটায় ৭টা! এই ট্রেনের সমস্যা (!) কী?
ফেরার দিন আসন ‘জ’ বগিতে, ট্রেনের মাঝামাঝি। ফাগুন এসে গেছে। শীত তো থাকার কথা নয়, তবু শীতলতার রেশ। এর সঙ্গে সোনারঙা রোদ মিশে বেশ মিষ্টি আমেজ। কু ঝিঁক ঝিঁক, কু ঝিঁক ঝিঁক। স্বচ্ছ জানালায় সাঁটা রুপসী বাংলা। আমরা রেখে যাচ্ছি দূরের গ্রাম, ধানক্ষেত, আলপথ আর তাল-সুপারির সারি।
সব ভালো তবু ওই ‘সমস্যা’র ভূত টেনে নিয়ে গেলো ইঞ্জিন বগি মানে ট্রেনের মাথার দিকে। রেলচালককেই জিজ্ঞেস করে আসা যাক। পথ আটকান বগি অ্যাটেনডেন্ট মো. জামিল হোসেন। আগমনের হেতু শুনে তার পরামর্শ, ড্রাইভারের বগিতে তো আপনারা যেতে পারবেন না। সবচেয়ে ভালো হয়- আপনারা হেড গার্ডের ওখানে চলে যান। তিনি এই ট্রেনের দায়িত্বে, সব বলতে পারবেন।
কোথায় তিনি?
‘একদম শেষ বগিতে’।
বোঝো! আছি মাথায়, যেতে হবে একেবারে লেজে। অগত্যা!

হেড গার্ডের দফতরে
হেড গার্ড প্রাতঃরাশ সারছিলেন। প্রাথমিক আলাপে এলো বসার অনুরোধ। শেষ বগির আগেরটি রসুই ঘর, এর আগে ক্যান্টিন। এদিক-ওদিক দৃষ্টি যায়। সামনে বসা ট্রেনের পাবলিক অ্যাডভাইজার মাহতাব উদ্দিন। বসে রয়েছি যখন আলাপ চলতে থাক।
নিজ পদের দায়িত্ব বুঝিয়ে বললেন, জেলাওয়ারি বিখ্যাত স্থান-ব্যক্তির ঘোষণা, আজানসহ বগিতে থাকা দু’টি টেলিভিশনে অনুষ্ঠানমালার তদারকি করি আমি। এছাড়া ধরেন, কোনো যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লো, সঙ্গে সঙ্গে মাইকে ঘোষণা করি- ট্রেনে কোনো ডাক্তার থাকলে এগিয়ে আসুন। প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধপত্র দেই। গুরুতর হলে কন্ট্রোলে যোগাযোগ করে ট্রেন থামিয়ে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করি।

যে বিষয়টি অবশ্যই লেখার অনুরোধ জানালেন, এতো ভালো একটি ট্রেন, তাও দেখেন সপ্তাহের (শুক্রবার বন্ধ) সোম-মঙ্গল-বুধ কমপক্ষে দেড়শ’ থেকে দুইশ’ সিট খালি যায়। ঠিক টাইমে যায়-আসে, সময় লাগে মাত্র সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। এসব লিখবেন, যেনো মানুষ আগ্রহী হয়।
ততক্ষণে হেড গার্ডের ডাক আসে। মেহেদি লাগানো দাড়িতে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করেন, কী জানতে চান?
নোটে টুকে রাখা প্রশ্নগুলো একে একে করতেই মাঝপথে থামিয়ে দিলেন- হ্যাঁ, এটা ঠিক, সুবর্ণ আগের চেয়ে প্রায় ৫০ মিনিট আগে পৌঁছাচ্ছে। আশা করছি, ভবিষ্যতে আরও দ্রুত পৌঁছাবে। যদিও সুবর্ণ আগের মতো এখনও একই গতিতে (গড় প্রতিঘণ্টা ৭০ কিমি, সর্বোচ্চ ৭২) চলছে। দেখুন, ট্রেন দেরিতে বা দ্রুত পৌঁছানোর বিষয়টি নির্ভর করে প্রকৌশলগত কারণে।

সেটি কীরকম? ‘কখনও রেললাইন মেরামত বা নতুন ব্রিজ নির্মাণকাজ চলাকালে স্বাভাবিকের চেয়ে ধীর গতিতে যেতে হয়। একই কারণে অন্য একটি ট্রেনের দেরির কারণে স্টেশনে ঢোকার সিগন্যাল পাওয়া যায় না। এখানেও টাইম নষ্ট হয়। আবার আমাদের কারণে অন্যদের লেট হয়। ’
শুরুর কৌতুকের কথা বললে জোর দিয়ে বলেন, এক্ষেত্রে বড় সমস্যাটি হলো, নির্ধারিত বগি না থাকা। দেখেন, সুবর্ণ (ট্রেন নম্বর- ৭০১) সকাল ৭টায় চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যায়। আবার দুপুর ৩টায় কমলাপুর থেকে সুবর্ণ (৭০২) ছেড়ে আসে। ৭০১ ঢাকা পৌঁছাবে সাড়ে ১২টায়। আবার এই বগি নিয়েই ৭০২ নম্বর ট্রেন ৩টায় ছেড়ে আসবে। মাঝে আড়াই ঘণ্টা। যদি প্রকৌশলগত কারণে লেটে ঢোকে, এর সঙ্গে যোগ করেন পরবর্তী যাত্রাপ্রস্তুতির প্রয়োজনীয় সময়। এভাবেই লেট হয়ে যায়। আমরা তো করতে চাই না, এসব পরিস্থিতি চলে আসে।
‘এছাড়া ইঞ্জিন পাল্টানোর জন্য ট্রেন বগিতে দেওয়া মাত্রই যাত্রীরা উঠতে শুরু করেন। ট্রেন ও বগি পরিষ্কার করার সময়টুকুও পাওয়া যায় না। ভালোভাবে পরিষ্কার ও সব ঠিকঠাক করে আমরা নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু এটি করতে গেলে ঠিক সময়ে ছাড়া যায় না। অনেক সময় ঠিক টাইমে ছাড়ার জন্য এসব না করেই রওনা দিতে হয়। এজন্য যাত্রীরা প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হন। দু’টি ট্রেনের জন্য নির্ধারিত বগি থাকলে কিন্তু এসবের কোনোটিই হতো না। সেটি তার মতো যাত্রার আগে প্রস্তুত হতে পারতো। অন্য ট্রেনগুলোরও একই অবস্থা। ’

পাশেই বসে ছিলেন সাদা ইউনিফর্মধারী বি. সি. বড়ুয়া। নাম পরে জেনেছি। আরও জানা গেলো, সুবর্ণ এক্সপ্রেসে গার্ড (গ্রেড-১) থাকেন দু’জন- কনডাকটর গার্ড (যাত্রীসেবা) ও ওয়ার্কিং গার্ড (কারিগরি ও অন্যান্য)।
ট্রেনের যাবতীয় দেখভাল, শিডিউল ব্যবস্থাপনাসহ কর্তৃপক্ষীয় জবাবদিহিতার সব ভার বি. সি. বড়ুয়ার কাঁধে। সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে জিজ্ঞেস করলে বলেন, সবই তো শুনলেন। এরপরও সুবর্ণ তার কলাকুশলীদের (প্রায় ৫৫ জন) নিরলস তৎপরতায় সঠিক টাইমে ছাড়ছে-আসছে। ছোটখাটো সমস্যা যে একেবারেই নেই তা বলবো না, কিন্তু মূল সমস্যা দূর করতেই আমরা হিমশিম খাচ্ছি। সেগুলো দূরও করে ফেলেছি। আমরা আমাদের দিকটা পূরণ করেছি, বাকিগুলোতে কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে।
ঠিক তাই। নিজেরাই যখন যাত্রী, তখন এটুকু দায়িত্ব নিয়ে তো বলতেই পারি- সুবর্ণর ৩টা মানে ৩টা, সাড়ে পাঁচ ঘণ্টাতেই ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা। এতো সুবর্ণ স্টাফদেরই কৃতিত্ব।

রসুইঘরের সুঘ্রাণ
কোথায় যেনো পড়েছিলাম, বাঙালির মনের রাস্তা গেছে পেটের অলিগলি দিয়ে। পেট খুশ তো দিল খুশ! গার্ডরুমে বসেই ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম। খাবারের কথা পাড়তেই হেড গার্ড সোজা পাঠিয়ে দিলেন এ দফতরের ম্যানেজার মো. গিয়াস উদ্দিনের কাছে। দরপত্রের মাধ্যমে সুবর্ণর রসুই দফতরের দায়িত্ব পেয়েছে ‘মেসার্স হাবিব বাণিজ্য বিতান’।

মেন্যু, মান প্রভৃতি নিয়ে শোনা যাক গিয়াসের মুখে, রেলওয়ের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী আমরা খাবার পরিবেশন করি। মান নিয়ে তাদের কঠোর অবস্থান। আমরাও মানের বিষয়ে খুব সচেতন। ‘ঢাকা ক্যাপিটাল’ ও চট্টগ্রামের ‘প্রাইম ফুড’ থেকে আমাদের খাবার আসে। এরপর যাত্রীদের কাছে প্যাকেজ আকারে সরবরাহ করি।
কী কী থাকে প্যাকেজে? ‘ফ্রায়েড চিকেন-জেলি ব্রেড (৫৫ টাকা), চিকেন বার্গার (৪৫), স্যান্ডউইচ-ডিম-প্লেইন কেক (৫৫), চিকেন রোল-প্লেইন কেক (৪৫), চিকেন কাটলেট-জেলি ব্রেড-প্লেইন কেক (৫৫)। ’ মূল্য তালিকা দেখালেন। রয়েছে আলাদা আলাদা অর্ডার করার সুযোগ।

সঙ্গে পানি, চা-কফি, কোল্ড ড্রিংকস, চিপস, চকলেট ইত্যাদি তো থাকছেই। সেসবও মানসম্মত বিভিন্ন কোম্পানির। একটু পর পর ক্যাটারিংয়ের স্টাফরা এসে ঘুরে যাচ্ছেন। কার কী লাগে। বলা মাত্র এসে যাচ্ছে গরমা-গরম হরেক পদ।

নিরাপত্তা ও অন্যান্য
এদিন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা সুবর্ণর বগি যাচ্ছে মোট ১৮টি (৯০০ সিট)। দিনপ্রতি গড় বগিসংখ্যা এরকমই। ট্রেন ছাড়ার নির্ধারিত সময়ের আগে পৌঁছানোর সুবাদে চোখে পড়লো, প্রত্যেক বগির গেটসংলগ্ন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রয়েছেন একজন করে বগি অ্যাটেনডেন্ট। ট্রেন ছাড়ার পরও বগির এক কোণায় সার্বক্ষণিক বসা। টিকিট দেখে সঠিক বগি ও সিট খুঁজে দেওয়া থেকে শুরু করে যাত্রীর যেকোনো প্রয়োজনে এগিয়ে আসছেন হাসিমুখে। এতো কড়াকড়ি আর সুব্যবস্থা তাতে টিকিটবিহীন যাত্রী নেই একজনও।
ট্রেন ছাড়ার আগে প্লাটফর্মে রেলওয়ে পুলিশের সতর্ক টহল তো ছিলোই, বন্ধ হয়নি যাত্রাপথেও। তিনজনের দল নিয়ে ট্রেনের ভেতরে টহল দিচ্ছেন সুবর্ণ এক্সপ্রেস ইনচার্জ সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই-ঢাকা থানা) মো. জামাল উদ্দিন।

নিরাপত্তা বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বলেন, যাত্রীদের নির্বিঘ্ন ও নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়াই আমাদের দায়িত্ব। এতে কোনো কমতি করি না। যাত্রার পুরোটা সময় টহল চলতে থাকে। সন্দেহজনক মনে হলে ব্যাগপত্তর বা কাউকে তল্লাশি করি।
বগিপ্রতি একটি করে ওয়াশরুম। দু’-তিনটে সিট পরপর ময়লা ফেলার ঝুড়ি। অ্যাডেনডেন্ট জাকিরুল ইসলাম বলেন, ওয়াশরুম পরিষ্কার, সাবান-টিস্যু ফুরিয়ে গেলে আবার দেওয়া, ময়লা ফেলে ঝুড়ি যথাস্থানে রাখা- এসব সময়মতো করছি। যাত্রীরা যাতে ভালোভাবে যেতে পারে সেই চেষ্টা করি।
যাত্রী নারায়ণ
যাদের জন্য এতোকিছু, সেই তারা কী বলছেন? চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গৃহিণী জেবুন্নেসার (৪২) সঙ্গে কথা হয়। তার ভাষ্য, ট্রেনের পরিবেশ খুব ভালো। অহেতুক চিৎকার-চেঁচামেচি নেই। ভালো- খাবারের মান, ওয়াশরুমসহ সার্বিক ব্যবস্থা। মূল কথা, বেশ শান্তি নিয়ে যাওয়া যায়।

চাকরিজীবী নুরুল ইসলাম (৩৬) চাকরিসূত্রে ঢাকা থাকেন। বলছেন, ভাই বাড়ি চট্টগ্রাম, বুঝতেই পারছেন- কতো যাওয়া-আসা পড়ে। আমি চেষ্টা করি সুবর্ণতেই যেতে। শুধু দিবা ট্রেন হওয়ায় অনেকসময় হয়েও ওঠে না। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম প্রায় সব ট্রেন চড়ে এটুকু বলতে পারি, সুবর্ণ এখন সবচেয়ে কম সময়ে যায়-আসে। আর শুধু বিমানবন্দর স্টেশন ছাড়া কোথাও দাঁড়ায় না। মান আগেও ভালো ছিলো, এখন ৫০ মিনিট সময় বেঁচে যাওয়াতে আরও ভালো হয়েছে। বাংলাদেশে ভাই এই অনেক!
ঠিক এটিই কথার ফাঁকে বলছিলেন, নাম বলতে অনিচ্ছুক সেই দাড়িতে মেহেদি লাগানো হেড গার্ড। ‘আপনি বিদেশের সঙ্গে তুলনা করলে তো হবে না। তাদের প্রেক্ষাপট আর আমাদের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি, করেও দেখিয়েছি। আপনারা ভালো যা আছে তা নিয়ে লেখেন। খারাপগুলো সবাই আগে দেখে! দেশের জিনিস ভাই, গর্ব করে লেখেন’।
বাংলাদেশ সময়: ১৫৪৮ ঘণ্টা, মার্চ ১, ২০১৬
এসএস/আইএ/জেডএম