ঢাকা, শনিবার, ২১ চৈত্র ১৪৩১, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ০৬ শাওয়াল ১৪৪৬

অর্থনীতি-ব্যবসা

ট্রাম্পের শুল্ক বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার পোশাকশিল্পে বড় ধাক্কা: নিউইয়র্ক টাইমস

আন্তজার্তিক ডেস্ক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৯৩৯ ঘণ্টা, এপ্রিল ৪, ২০২৫
ট্রাম্পের শুল্ক বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার পোশাকশিল্পে বড় ধাক্কা: নিউইয়র্ক টাইমস বাংলাদেশের একটি পোশাক কারখানায় নারী কর্মীরা পোশাক সেলাই করছেন। ফাইল ছবি

কোভিড মহামারির পর রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা তাদের তৈরি পোশাকশিল্পে ধস নামতে দেয়নি। এ শিল্পকে ভিত্তি করে নিজেদের সমৃদ্ধির প্রত্যাশা জিইয়ে রেখেছিল।

পোশাক রপ্তানিতে দেশ দুটির প্রধান বা বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে শুল্কারোপের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার পোশাক ব্যবসায়ীদের ওপর বড় ধাক্কা লাগতে যাচ্ছে।  

বুধবার ট্রাম্পের নতুন শুল্কের ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশকে দিতে হবে ৩৭ শতাংশ শুল্ক। আর শ্রীলঙ্কার ওপর ৪৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।  এতে দেশ দুটির ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। উভয় দেশের ব্যবসায়ী নেতাদের শঙ্কা, তারা হয়তো আর বড় উৎপাদনকারী শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠবেন না। তাদের অর্ডারগুলো কম শুল্কযুক্ত ও বড় শিল্প শক্তিসম্পন্ন দেশগুলোতে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে।

শ্রীলঙ্কার জয়েন্ট অ্যাপারেল অ্যাসোসিয়েশন ফোরামের পরামর্শক তুলি কুরে বলেন, ‘আমাদের তো দেখছি শোকবার্তা লিখতে হবে। ৪৪ শতাংশ কোনো রসিকতা কথা নয়। ’

শ্রীলঙ্কার কলম্বোর কাছে কাতুনায়াকেতে একটি পোশাক কারখানায় কর্মীরা পোশাক সেলাই করছেন।  ফাইল ছবি

একই অবস্থা বাংলাদেশেরও। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে বলে শঙ্কার কথা বলেছেন অর্থনীতিবিদরা। যা বাংলাদেশকে নতুন করে অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে বলে মনে করেন তারা।  

তবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক কমানোর চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

তিনি বলেছেন, ‘আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করছি। যেহেতু এটি আলোচনাযোগ্য, তাই আমরা আলোচনা করব এবং আমি নিশ্চিত যে আমরা সর্বোত্তম সমাধানে পৌঁছাতে পারব। ’

শুধু বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কাই নয়; ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপ বিশ্বব্যাপী পোশাক শিল্পের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত দেশগুলোকে বড় দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। ইকুইটি গবেষণা সংস্থা উইলিয়াম ব্লেয়ারের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত তৈরি পোশাকের প্রায় ৮৫ শতাংশ উৎপাদন করে, সেসব দেশের ওপর গড়ে ৩২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, পোশাক প্রস্তুতকারী দেশগুলোকে নিশানা করার মধ্য দিয়ে শুধু ওই সব দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না, এতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হবে।  

উইলিয়াম ব্লেয়ারের মতে, পণ্যের খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদেরই জন্যই সমস্যা হতে পারে।

বাংলাদেশ প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রে ৭০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। দেশটির মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ৪০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে এই খাত, যাদের বেশিরভাগই নারী। এ অঞ্চলে যেসব দেশে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক নারী কর্মী রয়েছেন, সেগুলোর একটি বাংলাদেশ। এত বেশিসংখ্যক নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ দেশটির জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করতে সাহায্য করেছে।

গত বছর ব্যাপক বিক্ষোভ ও সহিংসতার পর বাংলাদেশের স্বৈরশাসকের পতন হয়। এর পর থেকে দেশটি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে দেশটির জন্য তৈরি পোশাকশিল্প খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল এবং আমরা যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের পণ্যের বিক্রি বাড়তে দেখছিলাম, তখন এই ধরণের সিদ্ধান্তকে একটি বাণিজ্যযুদ্ধ বা একটি শুল্কযুদ্ধ বলা যায়। বিষয়টি এখন একটি নতুন চ্যালেঞ্জ এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ’

এই ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে এমন অনেক তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে, যারা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য সরবরাহের জন্য কাজ করে। কিছু কারখানা (নিজেদের তৈরি পণ্যের) ৮০ শতাংশ, আবার কিছু কারখানা ১০০ ভাগ পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে। এসব কারখানা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্ডারগুলো পাওয়ার জন্য বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। এই [শুল্কারোপের] সিদ্ধান্ত এসব ব্যবসাকে বিপদে ফেলবে। ’

শ্রীলঙ্কায় তৈরি পোশাকশিল্প খাতে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ নিযুক্ত রয়েছেন। যারা নাইকি ও ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেটের মতো বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করেন। দেশটির মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তাদের পোশাকের বড় অংশ রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে।

২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ধসে পড়েছিল। এরপর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রণোদনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে দেশটির অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ায়।

ট্রাম্পের নতুন শুল্কারোপের বিষয়ে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ক উপমন্ত্রী অনিল জয়ন্ত ফার্নান্দো বলেন, ‘আগামী ৯ এপ্রিল শুল্ক বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার আগে আমরা আলোচনার মাধ্যমে এটি কমানোর সুযোগ আছে কিনা, তা দেখার চেষ্টা করছি। বিশেষ করে আমরা যে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছি তা বিবেচনা করে। ’

তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

বাংলাদেশ সময়: ০৯২৫ ঘণ্টা, এপ্রিল ০৪, ২০২৫

এসএএইচ
 

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।