ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ চৈত্র ১৪৩১, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৪ শাওয়াল ১৪৪৬

জাতীয়

ফাঁকা সড়কে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালকরা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট  | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২২৩৫ ঘণ্টা, এপ্রিল ২, ২০২৫
ফাঁকা সড়কে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালকরা

ঢাকা: ঈদুল ফিতরের ছুটিতে রাজধানী ছেড়েছেন অসংখ্য মানুষ। ফলে ঢাকা এখন অনেকটাই ফাঁকা।

যানজটের শহরে ফাঁকা সড়ক পেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন মোটরসাইকেল চালকরা। সাধারণ সময় সড়কে চলাচলের নিয়ম-কানুন মেনে চললেও এখন সেই তোয়াক্কা নেই। ফলে দেখা দিচ্ছে দুর্ঘটনার শঙ্কা।

সাধারণ সময়ে যানজটের শহর ঢাকায় দ্রুত গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর সুযোগ থাকে না। পাশাপাশি বিভিন্ন মোড় ও স্থানে ট্রাফিক পুলিশের তদারকির কারণে নিয়ম মেনেই সড়কে চলাচল করেন বেশিরভাগ মোটরসাইকেল চালকরা। তবে ঈদে রাজধানীর সড়কগুলো ফাঁকা থাকায় দ্রুত গতিতে ছুটতে দেখা গেছে মোটরসাইকেল চালকদের। পাশাপাশি সড়কে ট্রাফিক পুলিশের তেমন কড়াকড়ি না থাকায় মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট পরা, দুইজনের বেশি আরোহী নিয়ে না চালানোসহ বিভিন্ন আইনের ব্যত্যয় ঘটাতে দেখা গেছে।

সোমবার (৩১ মার্চ) ঈদের দিন থেকে বুধবার (২ এপ্রিল) ঈদের তৃতীয় দিন পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ফাঁকা সড়ক পেয়ে গতির ঝড় তুলছেন বেশিরভাগ মোটরসাইকেল চালক। উঠতি বয়সীদের ভেতর এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। তাছাড়া অনেকে হাইড্রোলিক হর্ণসহ সাইলেন্সরে হলার ব্যবহার করে সৃষ্টি করছেন শব্দ দূষণ। এ তিনদিন বেশিরভাগ মোটরসাইকেল চালককেই হেলমেট ছাড়াই রাস্তায় চলাচল করতে দেখা গেছে। দুইজনের জায়গায় তিনজনও বহন করতে দেখা গেছে। অনেকে ছোট শিশুদের মোটরসাইকেলের সামনে বসিয়ে অনিরাপদভাবে চলাচল করছেন।

সড়কে চলাচলকারীরা বলছেন, ঈদের সময় বাড়ির শিশু কিশোররা অনেক সময় পরিবারের বড়দের মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরতে বের হয়। তাদের সড়কে চলাচলের অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রায় সময় দুর্ঘটনা ঘটে। ফাঁকা সড়কে তারা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গতি তোলে। মোটরসাইকেলের এ বেপরোয়া গতি যেমন তাদের নিজেদের জন্য বিপজ্জনক, তেমনি সড়কে চলাচলকারী অন্যদের জন্যও বিপদজনক।

ওয়েলকাম পরিবহনের চালক হায়দার বলেন, মোটরসাইকেল চালকরা সাধারণ সময়ই,উড়াধুরা চালায়। এখন ফাঁকা রাস্তায় তো টানের ওপর আছে। পোলাপাইন যারা চালায় তারা এদিকে ওদিকে বাউলি দেয়। বাস চালানোর সময় সব সময় মোটরসাইকেলের জন্য ভয়ে থাকতে হয়। তাদের জন্য দুর্ঘটনা ঘটে।

তবে এসব মোটরসাইকেল চালকদের মতে, তারা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোটরসাইকেল চালান না। ঈদের সময় হয়তো কেউ কেউ হেলমেট পরে না, তবে বেশিরভাগই পরে বলে দাবি তাদের। তিন দিনে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নেয় ১৬৯ জন আহত হয়ে।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে গত তিনদিনে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ১৬৯ জন। ঈদের আগের দিন রোববার (৩০ মার্চ) দিবাগত রাত ১২টা থেকে বুধবার (২ এপ্রিল) বিকাল ৩টা পর্যন্ত ১৬৯ জন আহত পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

হাসপাতালটির টিকেট কাউন্টারে দায়িত্বরতরা জানান, ঈদের আগের দিন দিবাগত রাত ১২টা থেকে ঈদের দিন দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত ৯০ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হাসপাতালে জরুরি বিভাগে এসেছেন। এর মধ্যে ৮৭ জন পুরুষ ও ৩ জন নারী। এছাড়া ঈদের দিন দিবাগত রাত ১২টা থেকে বুধবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত চিকিৎসা নিতে এসেছেন ৭৯ জন আহত। তাদের মধ্যে ৭৪ জন পুরুষ ও ৫ জন নারী।

আহতদের অনেককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে আবার অনেককে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতালটির কর্তৃপক্ষ। তবে কতজনকে ভর্তি করা হয়েছে সেটি জানাতে পারেননি তারা।

এদিকে হাসপাতালটির ক্যাজুয়েলিটি ওয়ার্ড-১ এ গিয়ে দেখা যায় সেখানে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত অনেকে অনেকে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। তাদের কারো হাত ভেঙে গেছে তো কারো পা।

তেমনি একজন মো. আল-আমিন। রাজধানীতে একটি ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এ যুবক পরিবারের সঙ্গে ঈদ আনন্দ করতে দিনাজপুরে গেছেন। সেখানেই ঈদের দিন বন্ধুদের নিয়ে মোটরসাইকেলে ঘুরতে বের হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। তারা ডান পা ভেঙে গেছে।

আল-আমিন বলেন, তিন বন্ধু মিলে একট মোটরসাইকেলে ঘুরতে বের হয়েছিলাম। পথে একটা বাঁকে একটি মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যায়। এ সময় ওই মোটরসাইকেলের চালকের হেলমেট খুলে রাস্তার ওপর চলে আসে। তখন একটি অটোরিকশা হেলমেট বাঁচাতে গিয়ে আমাদের মোটরসাইকেলে লাগিয়ে দেয়। সরাসরি এসে আমার পায়ে লাগে। আমার আরেক বন্ধুও আহত হয়েছে। তারও পা ভেঙে গেছে। কিন্তু
আমারটা গুরুতর হওয়ায় ঢাকায় নিয়ে আসতে হয়েছে।

কিশোরগঞ্জের দয়াল হোসেনও তার দুই বন্ধুকে নিয়ে এক মোটরসাইকেলে ঘুরতে বের হয়েছেন। মোটরসাইকেল চালাচ্ছিল তার বন্ধু। ইটনা-মিঠামইন রাস্তায় দ্রুত গতিতে চালানোর সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তারা সড়কে পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারান আল-আমিন। জ্ঞান ফিরলে দেখেন তিনি হাসপাতালে। তার বাঁ পায়ের উরু ও হাঁটুর নিচে হাড় ভেঙে গেছে।

আল আমিন বলেন, বন্ধুকে বলছিলাম আস্তে চালাতে। কিন্তু ফাঁকা সড়ক পেয়ে সে গতি কমায়নি। এখন আমি হাসপাতালে নিচ তলায় আর সে ৯ তলায় শুয়ে আছে। ঈদের আনন্দ পুরো মাটি করে দিয়েছে। তাও ভালো এখনো বেঁচে আছি।

বাংলাদেশ সময়: ২২৩৫ ঘণ্টা, এপ্রিল ২, ২০২৫
এসসি/জেএইচ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।