ঢাকা, শনিবার, ২১ চৈত্র ১৪৩১, ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ০৬ শাওয়াল ১৪৪৬

বাংলানিউজ স্পেশাল

জুলাই আন্দোলনে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছে

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০১০০ ঘণ্টা, এপ্রিল ৪, ২০২৫
জুলাই আন্দোলনে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছে

ঢাকা: প্রাণনাশের হুমকির মুখে আত্মরক্ষার জন্য যৌক্তিক অস্ত্র ব্যবহার ছাড়াও নিরাপত্তা বাহিনী অন্যান্য অনেক ঘটনায় নিয়মিতভাবে নির্বিচারে অতিরিক্ত গুলি চালিয়েছে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) তথ্যানুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনীর বে-আইনি বলপ্রয়োগ জনতার ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়। তারা জনগণের মাঝে এমন কিছু সৃষ্টি করে দেয়, যা প্রতিশোধমূলক হয়ে ওঠে এবং তারা হামলা চালায়। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল প্রধানত পুলিশ স্থাপনা, সরকারি ভবন এবং সাবেক সরকার প্রধান শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্মিত অবকাঠামো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ ও সরকারি ভবন আক্রান্ত হয়। তখন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়েছিলেন। সে সময়টায় অবশ্য আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র ব্যবহার যৌক্তিক ছিল। তথ্য ও সাক্ষ্য প্রমাণ অনুযায়ী, অন্যান্য অনেক ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনী নিয়মিতভাবে নির্বিচারে অতিরিক্ত গুলি চালিয়েছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করা এই প্রতিবেদন বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের সহজবোধ্যভাবে বোঝার সুযোগ করে দিতে অনলাইন নিউজপোর্টাল বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম-এর সম্পাদকীয় বিভাগ ইংরেজি থেকে হুবহু বাংলায় অনুবাদ করেছে। বাংলায় অনুদিত প্রতিবেদনটি ধারাবাহিকভাবে পাঠকদের কাছে সংবাদ আকারে তুলে ধরা হচ্ছে। আজ থাকছে সেই প্রতিবেদনের পঞ্চম পর্ব।

রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে আনা তুলে ধরে বলা হয়, তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হুমকি হয়ে না দাঁড়ালেও শটগানের গুলিতে তাকে জীবন দিতে হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথম দিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আন্দোলন দমনে টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট, সাউন্ড ও স্টান গ্রেনেড এবং ধাতব গুলিভর্তি শটগানব্যবহার করে। এসব অস্ত্রের ব্যবহারের ফলে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটে, যার মধ্যে অন্যতম ছিল শিক্ষার্থী আবু সাঈদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হুমকি হয়ে না দাঁড়ালেও শটগানের গুলিতে তাকে জীবন দিতে হয়। আন্দোলন আরও তীব্র হলে নিরাপত্তা বাহিনী আরও প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করতে শুরু করে। তারা সামরিক রাইফেল ব্যবহার করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী ও পথচারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়, এর ফলে শত শত মানুষ নিহত হন।

আওয়ামী লীগ সরকারের দমন পীড়ন নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত সরকার বিক্ষোভ দমনে ক্রমশ সামরিক কৌশল নিতে থাকে, যেখানে আধা সামরিক বাহিনী বিজিবি ও র্যা ব পুলিশের সঙ্গে যোগ দিয়ে জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় এবং অতিরিক্ত প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করে। নিরাপত্তা বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকারদের মধ্যে শিশুরাও ছিল। ওএইচসিএইচআর যে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ধরন ও মাত্রা নথিভুক্ত করেছে, তা থেকে বোঝা যায়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত বহু হত্যাকাণ্ড ও আহত করার ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। জুলাইয়ের মধ্যভাগ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে নিরাপত্তা বাহিনী শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং হাজারো মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী।

তথ্যানুসন্ধান দল ঘটনার সময় গুলিবর্ষণের বিভিন্ন ঘটনাও বিশ্লেষণ করেছে। ওএইচসিএইচআরের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বলা হয়, ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুলিশ দ্রুত গতিতে একের পর এক শটগানের গুলি ছুড়েছে, যা কাছাকাছি ভিড়ে থাকা মানুষের বুকে ও মাথার উচ্চতায় সরাসরি তাক করে চালানো হয়েছে। আবার, দূরের ভিড় লক্ষ্য করে কিছুটা উঁচুকোণে গুলি ছোড়া হয়। যাতে ধাতব ছররা দূর থেকেও মানুষকে আঘাত করতে পারে। এই কৌশল শটগানের প্রাণঘাতী ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দেয় এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি ও অন্ধত্বের ঝুঁকি বাড়ায়। ওএইচসিএইচআরের কাছে থাকা ফরেনসিক চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যেও দেখা গেছে, ধাতব ছররার আঘাতে আহতদের বেশিরভাগই বুকেও মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন।

প্রতিবেদনে অতিরিক্ত বল প্রয়োগের বিভিন্ন ঘটনা উপস্থাপন করে সংস্থাটি। এর মধ্যে উত্তরা এলাকা উল্লেখযোগ্য। ১৮ জুলাই সকালে পুলিশের সঙ্গে র্যা ব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, বিজিবি, আনসার ও সরকারি দলের সশস্ত্র সমর্থকরা উত্তরার বিএনএস সেন্টারে অবস্থান নেয়, কারণ সেদিন সকালে সেখানে বড় ধরনের বিক্ষোভের পূর্বাভাস ছিল। বেলা ১১টা ৩০ মিনিটের দিকে পুলিশ ও র্যা ব টিয়ারগ্যাস, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। এক প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, পরিস্থিতি ছিল ‘ধোঁয়া ও শব্দের সম্মিলিত বিস্ফোরণ’। ওএইচসিএইচআর একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য পেয়েছে; যেখানে বলা হয়েছে, পুলিশের একটি সাঁজোয়া গাড়ি বিক্ষোভকারীদের দিকে ধেয়ে যায় এবং সেই গাড়ি থেকে গুলি চালানো হয়।

বিকেলের দিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশ ও র্যা বকে বিভিন্নস্থান থেকে বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী গুলি চালাতে দেখা গেছে। কিছু ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী, উত্তরাপূর্ব থানার ছাদ থেকেও পুলিশ গুলি চালায়। শতাধিক বিক্ষোভকারী গুলিবিদ্ধ হন এবং কয়েকজন নিহত হন। একটি কাছের হাসপাতালে সেদিন ৯১জন আহত ও ছয়জন নিহতের তথ্য নথিভুক্ত করাহয়, যার মধ্যে পাঁচজন ছিলেন শিক্ষার্থী।

ওএইচসিএইচআরের বিশ্লেষণে প্রমাণিত হয়েছে, ভুক্তভোগীরা সাধারণত পুলিশ ও র্যা ব ব্যবহৃত প্রাণঘাতী গুলিতে আহত বা নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মীর মুগ্ধ, যিনি বিক্ষোভকারীদের মাঝে পানি বিতরণ করছিলেন। বিকেলের শেষ দিকে তিনি পুলিশের রাইফেলের গুলিতে মাথায় আঘাতপান এবং ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ওএইচসিএইচআরের যাচাই করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৪টা ৫০ মিনিটে উত্তরা রবীন্দ্রসরণি সড়কে তিনি গুলিবিদ্ধ হন।

এসব ছাড়া ওএইচসিএইচআর আরও বেশ কিছু ঘটনার নথিভুক্ত করেছে, যেখানে দেখা যায় নিরাপত্তাবাহিনী এমন বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী গুলি চালিয়েছে, যারা কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টিকরছিলনা। কিছু ক্ষেত্রে, নিরাপত্তাবাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে আহত ও অক্ষম হয়ে পড়া বিক্ষোভকারীদের গুলি চালিয়ে হত্যা করে, যার মধ্যে শিশুরাও ছিল।

সাভার, আজিমপুর, রামপুরা, বাড্ডার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে, পল্টনের বায়তুল মোকাররম মসজিদের কাছে, কুমিল্লায় গুলি এবং নির্বিচারে গুলি চালোনোর বিষয়টি প্রতিবেদনে উঠে আসে।

প্রতিবেদনের আরেকাংশে বলা হয়, ওএইচসিএইচআরের নথিভুক্ত তথ্যে দেখা গেছে, বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি বাস্তব পরিস্থিতিতে আরও এগিয়ে গিয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জনতার মধ্যে কিছু অংশ সহিংসতায় জড়িত হলে, নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়ই সম্পূর্ণ জনতার ওপর নির্বিচারে ও ব্যাপকভাবে প্রাণঘাতী গুলি চালিয়েছে। তারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী, সম্পদ বিনষ্টকারী এবং মৃত্যুর বা গুরুতর আহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করা কিছু ব্যক্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য করেনি। এতে পথচারীরাও আহত হয়েছেন, এমনকি ছোট শিশুরাও এই নির্বিচার গুলির শিকার হয়েছে, যা আরও স্পষ্টভাবে এধরনের গুলি চালানোর যথেচ্ছ ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।

ওএইচসিএইচআরের তদন্তকারীরা অন্যান্য বিক্ষোভস্থলেও ব্যাপক গোলাগুলির তথ্য নথিভুক্ত করেছেন।

আরওপড়ুন:
প্রথমপর্ব
হেলিকপ্টার থেকে গুলি প্রসঙ্গে যা আছে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে
দ্বিতীয়পর্ব
বিক্ষোভ দমনে গ্রেপ্তার, হত্যা, লাশ লুকানোর নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা
তৃতীয়পর্ব
রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে হামলার নেতৃত্বে সশস্ত্র আওয়ামী সমর্থকরা
চতুর্থপর্ব
ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে ব্যবহার হয়েছিল যেসব অস্ত্র


বাংলাদেশ সময়: ০১০০ ঘণ্টা, এপ্রিল ০৪, ২০২৫
ইএস/এমজেএফ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।